সরিষার তেল দক্ষিণ এশিয়ার রান্নাঘরের একটি বহুল ব্যবহৃত উপাদান। তবে এটি শুধুমাত্র একটি খাবার তৈরির উপকরণই নয়, স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীনকাল থেকে সরিষার তেলকে ঔষধি গুণাগুণের জন্য ব্যবহার করা হয়, এবং আধুনিক বিজ্ঞান এর অনেক উপকারিতার পক্ষে সমর্থন দিয়েছে। এ নিবন্ধে সরিষার তেলের বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
হৃদরোগ প্রতিরোধে সরিষার তেল
সরিষার তেলে উচ্চ মাত্রায় মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড (MUFA) এবং পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড (PUFA) থাকে, যা হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী। ২০১২ সালে American Journal of Clinical Nutrition-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, এই ফ্যাটি অ্যাসিডগুলো খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে এবং ভালো কোলেস্টেরল (HDL) বাড়াতে সহায়ক। এর ফলে রক্তে জমাট বাঁধার ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং হৃদরোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
সরিষার তেলে প্রাকৃতিক ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে, যা প্রদাহ কমাতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকর। এসব যৌগ রক্তনালীর নমনীয়তা বাড়িয়ে রক্তপ্রবাহকে স্বাভাবিক রাখে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
প্রদাহনাশক গুণ এবং আর্থ্রাইটিসে উপকারিতা
সরিষার তেলে অ্যালাইল আইসোথায়োসায়ানেট নামক একটি যৌগ রয়েছে, যা প্রাকৃতিক প্রদাহনাশক হিসেবে কাজ করে। প্রদাহ দীর্ঘস্থায়ী রোগের একটি বড় কারণ, এবং সরিষার তেলের এই গুণ বিভিন্ন প্রদাহজনিত রোগ যেমন আর্থ্রাইটিসের উপশমে সাহায্য করতে পারে। ২০১৬ সালে Journal of Medicinal Plants Research-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় সরিষার তেলের প্রদাহনাশক প্রভাবের কথা বলা হয়েছে।
অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল প্রভাব
সরিষার তেলের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল গুণ সুপরিচিত। এটি ব্যাকটেরিয়া এবং ফাঙ্গাসজনিত সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর। ত্বকের সমস্যার জন্য সরিষার তেল ব্যবহার করা হলে এটি সংক্রমণ কমিয়ে ক্ষত সারাতে সাহায্য করে। সরিষার তেল লাগানোর পর এর উষ্ণতাজনিত প্রভাবও ক্ষতস্থানে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়, যা দ্রুত নিরাময়ে সহায়তা করে।
হজম প্রক্রিয়ায় উন্নতি এবং পেটের গ্যাস সমস্যা কমানো
সরিষার তেল একটি প্রাকৃতিক ডাইজেস্টিভ এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। এটি অন্ত্রের পেশিগুলোকে উদ্দীপিত করে হজম প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। পাশাপাশি এটি ক্ষুধা বাড়ায় এবং পেটের গ্যাস ও ফোলাভাব কমায়। সরিষার তেল মালিশ করার সময় এর তাপ উত্পাদনকারী বৈশিষ্ট্য অন্ত্রের পেশি শিথিল করে।
শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা এবং ঠান্ডাজনিত অসুস্থতা নিরাময়
সরিষার তেল ঐতিহ্যগতভাবে ঠান্ডা, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট উপশমে ব্যবহৃত হয়। তেলে থাকা অ্যারোমাটিক যৌগ এবং প্রাকৃতিক অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গুণাগুণ শ্বাসনালী খুলে দেয়। গরম সরিষার তেল দিয়ে বুকে এবং পিঠে মালিশ করলে এটি কফ ও শ্লেষ্মা পরিষ্কার করতে সহায়ক।
ত্বক ও চুলের যত্নে সরিষার তেল
সরিষার তেলে ভিটামিন ই এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। এটি চুলের গোড়ায় পুষ্টি জোগায় এবং চুল পড়া রোধ করে। সরিষার তেল দিয়ে নিয়মিত মাথায় মালিশ করলে চুলের স্বাস্থ্য ভালো হয় এবং খুশকির সমস্যা কমে।
ক্যান্সার প্রতিরোধে সম্ভাব্য ভূমিকা
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সরিষার তেলে থাকা গ্লুকোসিনোলেট যৌগ ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। ২০১০ সালের একটি গবেষণায় Nutrition and Cancer জার্নালে প্রকাশিত হয় যে, সরিষার তেলের নিয়মিত ব্যবহার ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত সরিষার তেলের গুণাগুণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এটি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলেছে। তবে স্বাস্থ্যকর উপকারিতা পেতে নিশ্চিত করতে হবে যে তেলটি খাঁটি এবং রাসায়নিক মুক্ত। নিয়মিত এবং সঠিক পদ্ধতিতে সরিষার তেল ব্যবহার করলে এটি হতে পারে আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষার একটি প্রাকৃতিক এবং নিরাপদ সমাধান।
Add comment